নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ
গোদাগাড়ীতে সাবেক এমপির ‘ভাগ্নে’ পরিচয়ে ৪ ভাইয়ের মাদক সাম্রাজ্য: ১৭ বছর ধরে এলাকা জিম্মি।
রাজশাহীতে মাদক ও সন্ত্রাসী সাম্রাজ্যের হোতা মজিবর রহমানের চার ছেলে: নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর মামলার পাহাড়।
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী |
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর ভাগ্নে পরিচয়ে গোদাগাড়ী সীমান্ত ঘেষা জনপদ এখন এক আতঙ্কের নাম।এলাকায় গত দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে
এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে,
মাদকের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছে একই পরিবারের চার ভাই। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ডিমভাঙ্গা ও মাদারপুর এলাকাকে কেন্দ্র একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটটি শুধু মাদক নয়, অস্ত্র ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে
একই পরিবারের চার ভাই।
অভিযুক্ত চার ভাই হলেন— মো: মনিরুল ইসলাম (৪৮), মো: মেহেদী হাসান (৪৪), মো: আব্দুর রহিম টিসু (৪০) এবং মো: সোহেল রানা (৩৮)। তারা সবাই ওই গোদাগাড়ীর ডিমভাঙ্গা মাদারপুর এলাকার মো: মজিবর রহমানের ছেলে। সহ এই সিন্ডিকেটের আরো অনেকেই।
মাদক ও অস্ত্রের রাজত্ব
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চার ভাই এলাকায় ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। তাদের কথার অবাধ্য হলে সাধারণ মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া বা মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই নির্যাতনে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও সাবেক এমপির প্রভাব খাটিয়ে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনিরুল ইসলাম মনির(৪৫) কয়েকবছর আগেও তিনি ছিলেন নৌকার মাঝি পরে,
গোদাগাড়ী পৌরসভার কাউন্সিলর মাদকের ব্যবসা করে কয়েএক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, নামিদামি বেন্ডের বিলাসবহুল সব গাড়ি। চার ভায়ের জন্য রাজশাহী মহানগরীতে করেছেন রাজকীয় আলিশান একাধিক বাড়ি।
তদন্তে ও মামলার নথিতে এই চার ভাইয়ের অপরাধ জগতের দীর্ঘ তালিকা পাওয়া গেছে:
১. মনিরুল ইসলাম (৪৮): সিন্ডিকেটের শীর্ষ এই হোতার বিরুদ্ধে ৩টি মাদক মামলাসহ ৪ কেজি হেরোইন চোরাচালানের মামলা বিচারাধীন।
মামলা সংক্রান্ত: পুঠিয়া থানার মামলা নং-২৭ (২০১৭) এবং চারঘাট থানার মামলা নং-৫ (২০১৩)। এছাড়াও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গোদাগাড়ী থানায় হত্যাচেষ্টা ও দাঙ্গার একাধিক মামলা রয়েছে (মামলা নং ১০৪/২৪ ও ২৫১/২৫)। বর্তমানে তিনি দুটি রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় পলাতক।
২. মেহেদী হাসান (৪৪): তাকে এলাকার অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মামলা সংক্রান্ত: ২০১২ সালে মাদক আইনে মামলার পাশাপাশি বর্তমানে বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় (মামলা নং-৪৭৭/২৪) তিনি এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগও রয়েছে।
৩. মো. আব্দুর রহিম টিসু (৩৮): মাদকের এই ‘গডফাদার’ সর্বশেষ ৪ কেজি ৩০০ গ্রাম হেরোইন পাচারের মামলায় পলাতক রয়েছেন।
মামলা সংক্রান্ত: ২০১০ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা চলমান (বোয়ালিয়া ও গোদাগাড়ী থানা)। ২০২৪ সালের ৭ মে (FIR নং-১৩) হেরোইন পাচারের সময় তার বিরুদ্ধে কঠোর মাদক আইনে মামলা হয়।
৪. মো: সোহেল রানা (৩৮): আওয়ামী লীগের শীর্ষ ক্যাডার এবং বিতর্কিত ‘ব্যান্ডার বাহিনী’র মূল হোতা হিসেবে পরিচিত।
মামলা সংক্রান্ত: তার নামে মাদক ছাড়াও বিস্ফোরক ও পুলিশের ওপর হামলার একাধিক মামলা রয়েছে (মামলা নং-৩/২৪ ও ৭/২৪)। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় তিনি অন্যতম প্রধান আসামি।
পুলিশ জানায়, আবদুর রহিম টিপু রাজশাহীর অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারি। ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাজশাহীর শীর্ষ ১৫ মাদক কারবারির নামের তালিকা পাঠানো হয় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। ওই তালিকায় নাম ছিল টিপুর। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকের মামলাও আছে ৩ টি । এর মধ্যে ২০১০ সালের ২৩ আগস্ট রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানায় ২০১৫ সালের ২৫ জুলাই পবা থানায় ও ৭ মে গোদাগাড়ী থানায় টিপুর বিরুদ্ধে একটি করে মামলা হয়। এসব মামলার পরই আব্দুর রহিম টিপু পলাতক আছেন।
আরো গোপন সূত্রে জানা যায় টিপুর বড় ভাই মনিরুল হক মনি এখন গোদাগাড়ী পৌরসভার কাউন্সিলর। ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল রাজশাহীর চারঘাট থানা-পুলিশ পৌনে ৪ কেজি হেরোইন ও একটি মাইক্রোবাসসহ মনিকে গ্রেপ্তার করেছিল। মামলাটি এখনো আদালতে চলমান। কিছুদিন আগেও র্যাব-৫-এর রাজশাহীর একটি দল গোদাগাড়ী পদ্মার চর এলাকার ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের দিয়াড় মানিকচক থেকে এ দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
এদের মধ্যে দিয়াড় মানিকচক রাবনপাড়া গ্রামের মো. সোলায়মান (২০) ও রুহুল আমিন (৪০)। তাঁদের কাছ থেকে ৩ কেজি ৪০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। মূলত এ দুজনের মাধ্যমে টিপু ভারত থেকে হেরোইন সংগ্রহ করতেন। তারপর পদ্মা নদী পার করে এসব হেরোইন গোদাগাড়ীর বিভিন্ন স্থানে ও জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হতো।
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ঐ দুজন জানিয়েছিলেন, আবদুর রহিম টিপু চাহিদা মতো হেরোইনগুলো ভারত থেকে সংগ্রহ করতো। আমরা তার হয়ে এই মাদকগুলো সংরক্ষণ করছিলাম। একই মামলায় টিপুকে পলাতক আসামি করা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয় এবং অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।
সাবেক এমপি’র সাথে সম্পর্কের বিতর্ক:
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদক কারবার থেকে বাঁচতে গাড়িটি সাংসদকে উপহার দেয়,পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গেছে, ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের সময় মাদক কারবারি আবদুর রহিম টিপু তাঁর নামে কেনা একটি নতুন মাইক্রোবাস স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীকে দিয়েছিলেন। কালো রঙের গাড়িটি নিয়েই ওমর ফারুক চৌধুরী নির্বাচনে গণসংযোগ করেন। সেই থেকে গাড়িটি তার কাছেই আছে। ২০২২ সালে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক উঠলে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, টিপুর কাছ থেকে গাড়িটি কিনে নিয়েছিলেন তাঁর ছেলে।
অভিযোগ রয়েছে, এই মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর নির্বাচনের অন্যতম বড় অর্থদাতা বা ‘ডোনার’ হিসেবে কাজ করতেন। আওয়ামী সরকারের পতন হলেও এই মাদক কারবারিরা আজও প্রকাশ্যেই মাথা উঁচু করে ক্ষমতা এবং মাদকের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চার ভাই এলাকায় ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। তাদের কথার অবাধ্য হলে সাধারণ মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া বা মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই নির্যাতনে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও সাবেক এমপির প্রভাব খাটিয়ে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।
ভুক্তভোগীদের হাহাকার
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদারপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, “এই চার ভাই দেশ ও জাতির শত্রু। এদের হাতে অস্ত্র ও মাদক সব সময় মজুদ থাকে। এদের দাপটে আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি না। কেউ প্রতিবাদ করলেই তার পকেটে মাদক ঢুকিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়।”
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই চক্রের সদস্যরা কিছুটা আড়ালে গেলেও তাদের নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয় বলে জানা গেছে। এলাকাবাসী এই ভয়ংকর মাদক সিন্ডিকেট নির্মূল করতে এবং এই চার ভাইকে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
এই পরিবারের অত্যাচারে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। তাদের মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করলে উল্টো মাদক দিয়ে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
রাজশাহী-১ এলাকার এই কুখ্যাত মাদক সিন্ডিকেট নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Reporter Name 


















