সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম।। ঢাকার কাছে মুন্সীগঞ্জে ১৫ বছর রশি তৈরির কারখানায় কাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে দুই ভাই এবার কুড়িগ্রামের উলিপুরে নিজেরাই স্থাপন করলেন কারখানা। তাদের এই উদ্যোগ সাড়া ফেলেছে পুরো এলাকায়। আর্থিক সংকট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সমস্যার পরও থেমে থাকেনি তাদের যুদ্ধ। একটু পুঁজি পেলে পালটে যাবে কারখানার চেহারা। বাড়বে উৎপাদন এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান।
জানা গেছে, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত রাজবল্লভ দক্ষিণপাড়া গ্রাম। উপজেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে তিস্তা নদীর তীরবর্তী গ্রাম এটি। এই গ্রামের নুর মোহাম্মদের দুই ছেলে নজির হোসেন ও নুর আলম। মুন্সীগঞ্জে একটি রশি তৈরির কারখানায় চাকরি নেন তারা। নজির হোসেন অপারেটর এবং নুর আলম ইলেকট্রিশিয়ান হিসাবে। সেখানে কেটে যায় তাদের ১৫টি বছর। এক সময় তাদের মনে হয়, নিজেরাই তাদের গ্রামে এই ধরনের কারখানা খুলে হতে পারেন উদ্যোক্তা। সেই ভাবনা ও মনোবল নিয়ে দুই ভাই নিজেদের সঞ্চয় এবং বাবার জমি বন্ধকের টাকা দিয়ে ৫টি মেশিন ও কাঁচামাল কিনে শুরু করেন বিভিন্ন রঙের রশি তৈরির কাজ। ইতোমধ্যে কেটে গেছে দুটি বছর। এখন ১৫টি মেশিন চলছে তাদের কারখানায়। কাজ করছেন ৬ জন নারী শ্রমিক।শ্রমিক রোশনা বলেন, এই কাজ নেওয়ার ফলে সংসারে স্বস্তি ফিরে এসেছে। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারছে। স্বামীর সাহায্য হচ্ছে। অপর নারী শ্রমিক হোসনা বেগম বলেন, আমাদের এখানে কোনো কাজ ছিল না। কারখানা হওয়ায় আমাদের ভীষণ উপকার হয়েছে। আগে বাড়িতে বসে ছিলাম, এখন কাজ করে টাকা পাচ্ছি।
উদ্যোক্তা নজির হোসেন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন রশি তৈরির কারখানায় কাজ করার ফলে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সবই জানি। ছুটিতে বাড়ি এলে নিজেরা কারখানা করার পরিকল্পনা বাবার সঙ্গে শেয়ার করি। এতে বাবাও উৎসাহী হয়ে ওঠেন। আমরা দশ লাখ টাকা পুঁজি সংগ্রহ করি এবং বাড়ির ভেতরে কারখানার জন্য একটি বড় টিনের ঘর নির্মাণ করি। এরপর ৫টি মেশিন দিয়ে কারখানা চালু করি। এভাবেই আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে। নজির হোসেন বলেন, বর্তমানে আমাদের ১৫টি মেশিন চালু আছে। ৩৫ থেকে ৪০টি মেশিন হলে আমরা লাভবান হতে পারতাম। উৎপাদন বৃদ্ধি পেত, খরচ কমিয়ে আনতে পারতাম। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে মেশিন ও মালামাল কিনতে পারছি না। নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করছি। উৎপাদিত মালামাল স্থানীয়ভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। এখন বড় সমস্যা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। এখানে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকরা বসে থাকে। কাজের ক্ষতি হয়। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ক্ষুদ্র ঋণের জন্য সহযোগিতা চাইলেও পাইনি। কিছুটা মূলধন পেলে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি হলে বড় আকারে কারখানা বৃদ্ধি করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সেটা পারছি না। দুই উদ্যোক্তার বাবা নুর মোহাম্মদ বলেন, আমার ছেলে দুটি খুবই বুদ্ধিমান। তারা যে কোনো জিনিস দেখে সেটা তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। তবে জমি বন্ধক রেখে কারখানার কাজ শুরু করা হয়। এখনো সেভাবে লাভ হচ্ছে না। আর্থিক কারণে আমরা এগোতে পারছি না। উলিপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সমাজকর্মী লক্ষ্মণ সেন গুপ্ত বলেন, আমাদের উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় দুই ভাই যে উদ্যোগ নিয়েছেন এজন্য তাদের সাধুবাদ জানাই। নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কিছুটা পুঁজি পেলে তারা উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবেন। এতে স্থানীয়ভাবে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে মিলবে কর্মসংস্থান। উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, আমি নতুন এসেছি। আগে খোঁজখবর নিই, তারপর কী ধরনের সহযোগিতা করা যায় দেখব।

Reporter Name 


















